মার্কো পোলো - Marco Polo

মার্কো পোলো - Marco Polo

মার্কো পোলো - Marco Polo
মানুষের রক্তের সঙ্গে মিশে আছে ভ্রমণের নেশা একমাত্র ভ্রমণেই সে লাভ করে অনাবিল আনন্দ তার ওপর আছে অজানাকে জানার দুর্বার কৌতূহল এবং দূরের পানে ছুটে চলার দুর্নিবার আকর্ষণ তাইতো কবে কোন আদিম যুগ থেকে আজ পর্যন্ত মানুষ কেবল ছুটেই চলেছে সেই ছুটে চলার মধ্যেই তার আনন্দ, তার জয়যাত্রা আরণ্যক জীবন থেকে বৈজ্ঞানিক সভ্যতায় উত্তরণ সেই আদিকালেও, সে অপরাপর দশটা প্রাণীর মতো স্থবির হয়ে বসে থাকেনি সেদিনও সে বন থেকে বনান্তরে কেবল ছুটেই চলেছিল তাই তার অপ্রতিহত জয়যাত্রাকে কেউ রুখতে পারেনি না হিংস্র জীবজন্তু, না অরণ্যপর্বত-মরু-প্রান্তর সেদিন যে বা যারা ভ্রমণ করতে-করতে ইউফ্রেটিস টাইগ্রিস, নীলনদ কিংবা সিন্ধুর তীরভূমি আবিষ্কার করেছিল, দিকে-দিকে দুঃসাহসিক অভিযান চালিয়েছিল সেইসব মানুষের পরিচয় ঐতিহাসিকরা প্রদান করতে না-পারলেও তাদের তুল্য দেশ আবিষ্কারক পৃথিবীর কেউ হতে পারে না প্রকৃতপক্ষে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত সেইসব বীর অভিযাত্রীর কারণে মানব লাভ করেছে এগিয়ে চলার দীক্ষা
মানুষ যেদিন প্রথম নগর সভ্যতার পত্তন করেছিল, সেদিনও সুসভ্য দেশগুলি একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছিল আপন প্রয়োজনের তাগিদে সেই যোগাযোগের মাধ্যম ছিল জলযান স্থলপথেও যাতায়াত করত তবে বন্যজন্তুর আক্রমণ, দস্যু-তস্করের উপদ্রব প্রভৃতি না-থাকার জন্য জলপথ ছিল তাদের কাছে অনেকটা নিরাপদ তাই সভ্যতার প্রথম প্রত্যুষে নৌ-শিল্পের উন্নতির জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছিল মানুষ
তারপর কত হাজার হাজার বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে পৃথিবীর কত স্থানে গড়ে উঠেছে কত নগর কত রাজধানী মানুষের বুদ্ধিবৃত্তির যেমন হয়েছে প্রসার, তেমনই মনে দানা বেঁধে উঠেছে নানা সংস্কার জলের প্রতি ভীতি ও সংস্কার মানুষের ভ্রমণের ইচ্ছাকে করল অবদমিত খোলা ছিল একমাত্র স্থলপথ কিন্তু যন্ত্রযান আবিষ্কৃত না-হওয়ায় বিদেশ-ভ্রমণের একমাত্র অবলম্বন ছিল অশ্ব, উট প্রভৃতি পশু অন্যদিকে ওদের পিঠে আরোহণ করে শ্বাপদসঙ্কুল ও দুর্গম অরণ্যানী, সুদুস্তর মরুভূমি প্রকৃতিকে অতিক্রম করা সহজসাধ্য ছিল না তাই দূরের দিকে তাকিয়ে হাঁ করে বসে থাকত মানুষ আর কল্পনার জাল বুনত মনে মনে
তবু কোনো-এক দুর্বার আকর্ষণে দুঃসাহসীরা ছেড়েছিলেন ঘর জীবনের মায়া তাঁরা করেননি ভ্রমণের আনন্দ এবং আবিষ্কারের নেশা তাদের যেন পেয়ে বসেছিল সেদিন যারা ঘর ছেড়েছিলেন, তাঁদের অনেকেই ডুবে গেছেন বিস্মৃতির অন্ধকারে কেউ পথ ভুল করে পথের মাঝে রচনা করেছেন শেষশয্যা, কেউ হারিয়ে গেছেন মরুভূমি কিংবা অরণ্যের বুকে, কেউ প্রাণ দিয়েছেন হিংস্র জন্তু অথবা দস্যুতস্করের কবলে তাদের সবার সংবাদ মানুষ লাভ করতে পারেনি কেবল দু-চারজনের কথা কোনোরকমে সংগ্রহ করতে পেরেছে এই প্রসঙ্গে যার নাম সর্বাগ্রে মনে আসে তিনিই মধ্যযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ ভ্রমণকারী মার্কো পোলো সৌভাগ্যবশত মার্কো পোলো তাঁর নিজের ভ্রমণকাহিনী নিজেই লিপিবদ্ধ করে গেছেন পরবর্তীকালে সেই ভ্রমণকাহিনী অনেকের হাতে পড়ে এবং সবাইকে দান করে ভ্রমণের প্রেরণা মধ্যযুগে ইউরোপে দেশ-আবিষ্কারের জন্য যে-প্রচণ্ড সাড়া পড়ে গেছিল তার মূলেও ছিল মার্কো পোলোর ভ্রমণবৃত্তান্ত
এই প্রসঙ্গে পৃথিবীর অতীত ইতিহাসের দিকেও একবার দৃষ্টি নিক্ষেপ করা যেতে পারে সেকালে পৃথিবীটা যেন বিচ্ছিন্নই ছিল কত রাজ্য, কত রাজধানীর উত্থান ও পতন হয়েছে কিন্তু পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ বড়-একটা ছিল না কিংবা যোগাযোগ স্থাপন করার কোনো চিন্তাই কেউ পোষণ করত না তাই এক-একটি রাজ্য তার প্রতিবেশী রাজ্যগুলির কাছেও একরকম অপরিচিত ছিল যখন কোনো রাজা প্রবল হয়ে উঠতেন তখনই পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলিকে গ্রাস করার জন্য চালাতেন অভিযান যারা আরও প্রবল হয়ে উঠতেন তারা রাজ্যজয় এবং পররাজ্য লুণ্ঠনের জন্য অভিযান প্রেরণ করতেন দেশ-দেশান্তরে রাজায় রাজায় যুদ্ধ বাধত কিন্তু তার স্পর্শ খুব বেশিদূরে অনুভূত হত না কদাচিৎ কোনো দিগ্বিজয়ী বীর সাঙ্গোপাঙ্গদের নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন দিগ্বিজয়ে রাজনৈতিক ফলাফল যাই হোক না কেন লাভ অবশ্যই কিছু হত একদেশের সভ্যতা, সংস্কৃতি ও বিজ্ঞান ছড়িয়ে পড়ত অন্য দেশে ঐতিহাসিকরাও রেখে যেতেন বিবরণী কিন্তু সেই বিবরণী ভ্রমণকাহিনী নয় কেবল যুদ্ধ ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ইতিহাসের রাজপথের বাহিরে যে-অগণিত মানুষ বাস করে; সমৃদ্ধিশালী নগর ও বন্দর ছাড়াও যে শত শত জনপদ আছে; কত বন, কত পাহাড়, পর্বত, কত মরুপ্রান্তর যে আছে দেশে দেশেসে-খবর পাওয়া যায় না ঐতিহাসিকদের বিবরণ থেকে অথচ এইগুলির দিকেই মানুষের চিরন্তন আকর্ষণ তাইতো সেদিনের মার্কো পোলোর ভ্রমণকাহিনী সর্বকালের মানুষের কাছে সমান প্রিয় ইনিই একমাত্র ভ্রমণকারী, যার পূর্বে প্রাচ্যে ও পাশ্চাত্যের এমন বিস্তীর্ণ এলাকার বৃত্তান্ত কেউ প্রদান করতে পারেননি বোধ করি সেকালের কোনো মানুষই জানত না এত দেশ, নগর, রাজ্য ও রাজধানীর কথা সেদিক থেকে মার্কো পোলো শ্রেষ্ঠ দেশ-আবিষ্কারকদের মধ্যে অন্যতম

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য