মাদাম তুসো মিউজিয়াম - বিশ্বের এক অপূর্ব জাদুঘর - Madame-Tussauds- Museum- London


মাদাম তুসো মিউজিয়াম - বিশ্বের এক অপূর্ব জাদুঘর - Madame-Tussauds- Museum- London
মাদাম তুসো মিউজিয়াম - বিশ্বের এক অপূর্ব জাদুঘর
মাদাম তুসো লন্ডনের মেরিলিবোন স্ট্রিটের মাদাম তুসোর মোম-জাদুঘরের মতো সংগ্রহশালা সারা দুনিয়ায় দ্বিতীয়টি নেই। এই জাদুঘরের প্রতিটি ঘরে সাজানো আছে অতীত ও বর্তমানের অসংখ্য নরনারীর আশ্চর্য জীবন্ত সব প্রতিমূর্তি! এই মূর্তিগুলোর সবই মোম দিয়ে তৈরি। তাদের মধ্যে কেউ বিখ্যাত, কেউ বা কুখ্যাত, কেউ ইতিহাসপ্রসিদ্ধ, আবার কেউবা বর্তমান শতকের সেরা রাষ্ট্রনেতা, লেখক, শিল্পী, পর্যটক, খেলোয়াড় বা অভিনেতা। হল অব ফেম নামে একটি প্রশস্ত কক্ষে রাখা আছে এদের অনেকেরই মূর্তি। এছাড়া বিশ্ব ইতিহাসের নানা স্মরণীয় ঘটনাকে মূকনাট্য বা ট্যাবলোর ছাদে অমর করে রাখা হয়েছে অন্যান্য ঘরগুলোতে। সেখানকার অধিকাংশ পাত্রপাত্রীও আমাদের পূর্বপরিচিত। তাদের বসা বা দাঁড়ানোর ভঙ্গি, মুখের ভাব, গায়ের রঙ, সাজপোশাক ইত্যাদি দেখে মনেই হয় না যে তারা নিষ্প্রাণ মোমের পুতুল, বরং সন্দেহ হয় এই বুঝি তারা নড়ে উঠল! এ-জাদুঘর দেখা তাই এক আশ্চর্য অভিজ্ঞতা।
এমন এক সংগ্রহশালার পরিকল্পনা প্রথম এসেছিল মেরি তুসো নামে অষ্টাদশ শতকের এক ফরাসি মহিলার মাথায়। মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম হয়েছিল তার। সংসারে কাজের ফাঁকে মোমের পুতুল বানানো ছিল তার নেশা। প্রথমে প্যারিসে, তারপর লন্ডনের বেকার স্ট্রিটে সাময়িকভাবে করা হয়েছিল তাঁর গড়া পুতুলের এক প্রদর্শনী। অভূতপূর্ব দর্শক-সমাগম হওয়ায় তার বংশধরেরা স্থায়ীভাবে খুলে বসলেন এক সংগ্রহশালা। বার্নাড তুসো ঐ জাদুঘরের প্রধান শিল্পী ও ম্যানেজার। তিনি মেরি তুসোরই বংশধর। মাদাম ত্যুসোর জন্ম ১৭৬১ সালে প্যারিসে। ছোটবেলায় কাকার কাছে মোমের মূর্তি গড়া শেখেন মাদাম তুসো। তুসো একসময় রাজা ষোড়শ লুইয়ের বোন এলিজাবেথকে মোমের মূর্তি তৈরি-করা শিখিয়েছিলেন। চাচার মৃত্যুর পর চাচার হাতের তৈরি সবগুলো মোমের মূর্তি উত্তরাধিকারসূত্রে তাঁর হাতে আসে। মোট তিরিশটি মূর্তি নিয়ে মেরি তুসো ফ্রান্স ছেড়ে ইংল্যান্ডে চলে আসেন পাকাপাকিভাবে। ৪১ বছর বয়স থেকে ৭৪ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি এক শহর থেকে আরেক শহরে মোমের মূর্তির প্রদর্শনী দেখিয়ে বেড়াতেন। আর এর ফাকে-ফাঁকে চলত নতুন মূর্তি গড়া। মূর্তির উপযোগী পোশাক, উপযুক্ত পরিবেশ নির্মাণ এবং সঠিক আলো নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রচুর টাকা ব্যয় করতে দ্বিধা করতেন না। যে-গিলোটিনের ব্লেডে ফ্রান্সের রাজার মুণ্ডু কাটা গিয়েছিল, সেই ব্লেড এবং চতুর্থ জর্জ যে-পোশাক পরে সিংহাসনে বসেছিলেন সে-পোশাক যোগাড় করার জন্য মাদাম তুসো অনেক টাকা ব্যয় করেছিলেন। ১৮৩৫ সালে বেকার স্ট্রিটে সাময়িকভাবে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করলেন মাদাম তুসো। ১৮৫০ সালে তাঁর মৃত্যু হয়।
তুসোর সংগ্রহশালায় ঢোকবার মুখে এখনো সাজানো আছে বৃদ্ধা মেরি তুসোর এক জীবন্ত মূর্তি। শোনা যায় বৃদ্ধবয়সে নিজের হাতেই নিজের মুখের ছাঁচ তুলে রেখেছিলেন তিনি। পরে সেই ছাঁচ থেকেই। গড়া হয়েছে এই মূর্তিটি! শুধু এই মূর্তিটি নয়, আরও প্রায় পঞ্চাশটি মূর্তি গড়া হয়েছে এই পদ্ধতিতে। ভলটেয়ার, স্যার ওয়ালটার স্কট, বেনজামিন ফ্রাঙ্কলিন প্রমুখ খ্যাতনামাদের মৃতদেহ থেকে সরাসরি তুলে নেওয়া হয়েছিল প্লাস্টারের ছাঁচ। সেই ছাঁচে মোম ঢেলেই পরে গড়ে নেওয়া হয় তাঁদের প্রতিমূর্তি। তবে এই মূর্তিগুলির থেকেও চমকপ্রদ হচ্ছে মেরির নিজের হাতের বানানো কতকগুলি মরণ-মুখোশ বা ডেথমাস্ক। ফরাসি বিপ্লবের সময় রাজপরিবারের অনেকেই প্রাণ দিয়েছিলেন গিলোটিনে। সেই ষোড়শ লুই, মেরি আঁতোয়ানেৎ প্রমুখের সদ্য-কাটা ছিন্নমুণ্ড থেকে সরাসরি বানানো হয়েছে ওই মুখোশের ছাঁচগুলি। আসলে ওই কাজ করতে বাধ্য হয়েছিলেন মাদাম তুসো। কারণ রাজপরিবারের বন্ধু হিশেবে তিনিও তখন কারাগারে বন্দি। নেহাত মূর্তিগড়ার অপূর্ব প্রতিভা ছিল বলেই অন্ধকার কারাকক্ষের মধ্যে সে রক্তাক্ত মুণ্ডগুলি থেকে তাঁকে তুলতে হয়েছিল মুখোশের ছাঁচ। ওই দিনগুলো কোনোদিনই ভুলতে পারেননি মেরি। তাই আলাদা একটা ঘরে সাজিয়ে রাখা হয়েছে ওই ডেথ-মাস্কগুলি।
বাইরে থেকে দেখলে মাদাম তুসোর জাদুঘরকে মনে হয়, এটা বুঝি একটা থিয়েটার! কিন্তু টিকিট কেটে একবার ভিতরে গেলেই ভুল ভাঙতে দেরি হবে না। দরজার পাশে টিকিট পরীক্ষার জন্যে যে-কর্মচারীটি দাঁড়িয়ে আছে তাকে টিকিট দেখাতে গেলেই অপ্রস্তুতের একশেষ। কারণ সে তো মানুষ নয়, সে-যে এক মোমের পুতুল! এখানেই চমকের শেষ নয়, শুরু। কয়েকপা এগিয়ে গেলেই চোখে পড়বে একপাশে সোফার উপর বসে ঢুলছেন এক মহিলা, তার কোলের উপর থেকে মেঝেতে খসে পড়েছে গাইড বুকটি। কেউ যদি ভদ্রতা করে সেটি তুলে দিতে যায় তবে আর-এক প্রস্থ অপ্রস্তুত হতে হবে তাকে। কারণ ওই মহিলাও মাদাম তুসোর আর-এক শিল্পকীর্তি!
এরপর পাথরের সিঁড়ি ভেঙে উঠতে হবে দোতলায়। সেখানে প্রত্যেকটি ঘরে আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। চমকের পর চমক। কোথাও সপারিষদ বসে আছেন রানী এলিজাবেথ, কোথাও মেরি কুইন অব স্কটসকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বধ্যভূমিতে, কোথাও ওয়েলিংটন বা নেপোলিয়ন দাড়িয়ে আছেন যুদ্ধক্ষেত্রে, কোথাও-বা দেখা যাচ্ছে স্বনামধন্য গ্রেসকে তাঁর ক্রিকেট খেলার প্রিয় ও পরিচিত পোশাকে। কয়েকজন প্রসিদ্ধ ভারতীয় ব্যক্তিত্বের মূর্তি আছে এই সংগ্রহশালায়। মহাত্মা গান্ধী ও নেহেরুর পাশে সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে ইন্দিরা গান্ধী ও রাজীব গান্ধীর প্রতিমূর্তি। তবে বিখ্যাত ব্যক্তির শত-শত মূর্তি যতই জীবন্তভাবে গড়া হোক না কেন দর্শকের সব থেকে বেশি ভিড় হয় বিভীষিকাগৃহে বা চেম্বার অব হররে। সেখানে প্রায় একশোজন আততায়ীর আক্রমণোদ্যত মূর্তি সাজানো আছে নানা কায়দায়। দেখলেই হিম হয়ে যায় গায়ের রক্ত।
একজন বেতার-ভাষ্যকার বাজি রেখে রাত কাটাতে গিয়েছিলেন ওই বিভীষিকাগৃহে। কিন্তু কিছুক্ষণ থেকেই প্রাণভয়ে পালিয়ে আসেন তিনি। কারণ প্রতি মুহূর্তেই তার মনে হচ্ছিল, বুঝি ঝাঁপিয়ে পড়ল কোনো আততায়ী!
সংগ্রহশালায় মূর্তি করবার আগে কীভাবে তোড়জোড় করা হয় তা শুনলে অবাক হতে হবে। প্রথমে বিশ্বের বিখ্যাত নরনারীর একটি তালিকা তৈরি করেন বিশেষজ্ঞরা। তারপর তাদের একে একে আমন্ত্রণ জানানো হয় আসার জন্যে। এরপর আমন্ত্রিত মানুষটি সময়-সুযোগমতো এসে হাজির হলে এঁকে রাখা হয় তাঁর এক পূর্ণাবয়ব তৈলচিত্র। তখনই দর্জি যেমন গায়ের মাপ নেন, ঠিক সেইভাবে নেওয়া হয় তাঁর মুখ ও মাথার মাপ! তুসোর কর্মীরা তারপর বিভিন্ন দিক থেকে তোলেন তিরিশটি ফটোগ্রাফ বা পোট্রেট। এখানেই শেষ নয়, চুল ও গায়ের রঙ সম্পর্কে খুঁটিনাটি বিবরণ লিখে রাখা হয় একটি নোটবুকে। সবশেষে এইসব দেখে পরে বার্নার্ড নিজের হাতে বানান একটি মাটির মূর্তি। কয়েকদিন ধরে চলে তার রদবদল। তারপর চূড়ান্তভাবে সেই মূর্তিটি পছন্দ হলে তার থেকে তোলা হয় এক প্লাস্টারের ছাঁচ। সেই ছাঁচে রঙ-মেশানো মোম ঢেলে তৈরি করা হয় আসল মূর্তিটি। এরপর মানুষেরই চুল একটি একটি করে বসাতে হয় মাথায়। ওই একইভাবে লাগাতে হয় দাড়ি, গোঁফ ও ভুরু। এরপর ঠিকমতো পোশাক পরিয়ে যথাযোগ্যভাবে সাজানো মঞ্চে স্থাপন করা হয় সেই মূর্তিটিকে। তখনই তা হয়ে ওঠে এক অনবদ্য শিল্পকীর্তি।
মাদাম ত্যুসোজ- এর শিল্পীদের কাজে সহায়তা করার জন্য অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিই যথেষ্ট সময় দিয়েছেন। উইনস্টন চার্চিলের মতো বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব দুবার সিটিং দিয়েছেন শিল্পীদের সামনে। এডিনবার্গের ডিউক সময় দিয়েছেন বহুবার। নিজেদের মূর্তিকে নিখুঁত করার জন্য অনেকেই নিজেদের পোশাকের সেট উপহার দিয়েছেন। মার্শাল টিটো, জেনারেল আইসেনহাওয়ার তাদের ইউনিফর্ম পাঠিয়ে দিয়েছিলেন মাদাম তুসোজ-এ। মাদাম তুসোর মূর্তিগুলো সাধারণত খুব নিখুঁত হয়। এ নিয়ে একটা মজার ঘটনা আছে। বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক ও অভিনেতা আলফ্রেড হিচকক একটা ছবির স্যুটিং করছিলেন। তাঁর এক ভক্ত মহিলাদর্শক একদৃষ্টে তাকিয়েছিল তাঁর দিকে। তখন হিচকক তাকে বলেছিলেনঃ আমাকে ওভাবে দেখবেন না, যদি ভালো করে দেখতে চান তাহলে মাদাম তুসোজ-এ চলে যান, ওখানে আমার নিখুঁত মূর্তি আছে। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য