ক্যালেন্ডারের ইতিহাস - History of Calendar


ক্যালেন্ডারের ইতিহাস - History of Calendar
ক্যালেন্ডারের ইতিহাস -  History of Calendar 
সভ্যতার আদিকালে মানুষ দেখত সকালবেলা সূর্য ওঠে আর সন্ধেবেলা ডোবে এর থেকে সে ঠিক করল যে, সূর্য উঠলে দিন হয়, আর ডুবলে হয় রাত এর বহুযুগ পরে তার কাছে মাসের ধারণা দেখা দিল যখন সে লক্ষ্য করল চাঁদের হ্রাস আর বৃদ্ধি সম্ভবত ঋতুর পরিবর্তন তাকে জানাল বছরের হিসাব মানুষ ধীরে ধীরে পেল বৈজ্ঞানিক ধারণা যে পৃথিবী তার কক্ষপথে পরিক্রমা করতে যে-সময় নেয় তাকে এক-বছর বলা যায় জানল যে পৃথিবীকে চাঁদের পরিক্রমার সময় হল এক মাস নিজের অক্ষের (axis) ওপর পৃথিবীর পূর্ণ আবর্তনে একটা দিন পুরো হয়
প্রাচীন মিশর তার ক্যালেন্ডার বানিয়েছিল ১২ মাসে আর প্রতি মাসে হত ৩০ দিন বছর শেষ হলে বাড়তি দিন জুড়ে বছরের হিসাব হত ৩৬৫ দিনে সেকালের গ্রিসে হিসাব হত চান্দ্রমাসে তারা প্রতি বছর অন্তর মাস যোগ করে দিত গ্রিস জ্যোতির্বিদ মাতন (Maton) ৪৩২ খ্রিস্টপূর্বাব্দে হিসাব করে দেখলেন যে ২৩৫ চান্দ্রমাসে পুরো ১৯ বছর হয় রোম-সম্রাট জুলিয়াস সিজার (Julius Caesar) ৪৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ক্যালেন্ডার সংস্কারের কাজে প্রথম হাত দেন তাঁকে সাহায্য করেন আলেকজান্দ্রিয়ার জ্যোতির্বিদ সোসিজিনিস (Sosigenes) এই ক্যালেন্ডার বা পাঁজি তৈরি হল সূর্যের চারদিকে পৃথিবীর পুরো একটা পরিক্রমার ওপর নির্ভর করে নাম দেয়া হল সৌর-বছর সিজারের জ্যোতির্বিদরা তাই ঠিক করলেন যে, বছরে থাকবে ৩৬৫ দিন আর বছর অন্তর বছর হবে ৩৬৬ দিনের কেননা প্রতি বছর যে সিকি-দিন বাদ যাচ্ছে, চতুর্থ বছরে গিয়ে দিনের হিশাব পুরো হবে চতুর্থ বছরের নাম দেয়া হল লিপইয়ার (leap year) সুতরাং এঁদের হিসাবে যে-বছরকে দিয়ে ভাগ করা চলে সে-বছরই হবে লিপইয়ার ৩৬৫ দিনকে ভাগ করা হল ১২ মাসে ১২ মাসের মধ্যে ৩১ দিন করে পেল জানুয়ারি, মার্চ, মে, জুলাই, অগাস্ট, অক্টোবর আর ডিসেম্বর ৩০ দিন করে পেল এপ্রিল, জুন, সেপ্টেম্বর আর নভেম্বর ফেব্রুয়ারিকে দেয়া হয় ২৮ দিন আর লিপইয়ারে এর দিনের সংখ্যা হবে ২৯
১৬০০ বছর এই ক্যালেন্ডার দিয়ে কাজ চলল কিন্তু তখন দেখা গেল যে, ১০ দিনের হিসাব গরমিল হয়ে গেছে কারণ হল যে পৃথিবীর সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে লাগে ৩৬৫.২৪২২ দিন তার মানে হল যে বছরে . দিন বাড়তি ধরা হয়েছে এই হিসাব শোধরাবার জন্য খ্রিস্টানদের ধর্মগুরু পোপ গ্রেগরি (Pope Gregore XIII 1502-1585) ১৫৮২ সনে ঠিক করলেন, শতাব্দীর যে-বছরকে ৪০০ দিয়ে ভাগ করা যাবে না সে- বছরকে লিপইয়ার বলে গণ্য করা হবে না তার মানে সে-বছরে ফেব্রুয়ারি ২৮ দিনের হবে এর ফলে ১৭০০, ১৮০০, ১৯০০ এই বছরগুলো লিপইয়ার হবে না কিন্তু ২০০০ সাল লিপইয়ার হবে এই ক্যালেন্ডারের নাম গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার পৃথিবীর সর্বত্রই আজ এই ক্যালেন্ডার প্রচলিত
অপর একটি ক্যালেন্ডার প্রচলিত তাকে বলা হয় চান্দ্রবছর চাদের পৃথিবীকে পরিক্রমার ওপর ভিত্তি করে এই ক্যালেন্ডার তৈরি হয় এর জন্য চাঁদের লাগে সাড়ে ২৯ দিন, তার মানে বছরে ১২ বার চক্কর দিতে লাগে ৩৫৪ দিন (সাড়ে ২৯ X ১২) এর ফলে সৌর-বছরের তুলনায় চান্দ্রবছর তার ৩৫৪ দিনের হিসাবে ১১ দিন করে কম পাচ্ছে, তার মানে বছরে ৩৩ দিন কম এই তারতম্য দূর করার জন্য প্রতি বছর অন্তর ১৩ মাসের বছর হয় আর এই বাড়তি মাসের নামমল মাস' সঠিক হিসাবের জন্য অনুপাত করে চান্দ্রদিনের সংখ্যা এগিয়ে বা পিছিয়ে দেয়া হয়
ভারতে প্রায় প্রতি রাজ্যে বা প্রতি জাতিসত্তার একটি করে নিজস্ব পাজি আছে এর কোনোটা সৌর আর কোনোটা-বা চান্দ্রবছর এইসব তারতম্য দূর করার জন্য আর ভারতের জাতিগত একতার জন্য ভারত-সরকার ২২ মার্চ ১৯৫৭ ঠিক করলেন শকাব্দের পুনঃপ্রচলন শকাব্দ মেনে চলে চান্দ্রমাস শকাব্দ চালু হয়েছিল ৭৮ খ্রিস্টাব্দে শক-সম্রাট কনিষ্কের সিংহাসনারোহণের তারিখ থেকে ফলে শকাব্দ খ্রিস্টাব্দের চেয়ে ৭৮ বছর পিছিয়ে রয়েছে পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও খ্রিস্টাব্দ ছাড়া তাদের নিজের নিজের আলাদা পাজি আছে প্রধানত এইসব পাজি বা ক্যালেন্ডারের উপযোগিতা তাদের ধর্মানুষ্ঠানের জন্য ক্যালেন্ডার তৈরি বা সংশোধন করে ৩৬৫ দিনে ১২ মাস পাওয়া গেলজানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি, মার্চ এপ্রিল, মে, জুন, জুলাই, অগাস্ট, সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বর, ডিসেম্বর এখন বলো তো মাস তাদের নাম পেল কোথায়?
জানুয়ারি হল বছরের প্রথম মাস নামটা আসছে রোমানদের দেবতা ইয়ানুস বা ইংরেজিতে জেনাস (Janus) থেকে
ফেব্রুয়ারি নাম আসছে রোমানদের ফেব্রুয়াম (Februam) উৎসব থেকে মার্চ মাস তার নাম পাচ্ছে রোমানদের যুদ্ধ-দেবতা মার্জ (Mars) থেকে
এপ্রিল মাস তার নাম পাচ্ছে লাতিন শব্দ আপেরিরে (aperire) থেকে, যার মানে হল খুলে-ধরা সম্ভবত এই সময় ফুলের বাহার দেখা দেয়, রবিশস্য কাটা হয় সেইজন্য এই নাম এ্যাংলো-স্যাক্সনরা এই মাসের নাম রেখেছিল ঈস্টার-মাস
মে মাসের নাম এল রোমানদের দেবী মাইয়া (Maia) থেকে
জুন মাস সম্ভবত তার নাম পেয়েছিল স্বর্গের দেবী জুনিয়ুস (Junius) থেকে
জুলাই তার নাম পেল রোম-সম্রাট জুলিয়াস সিজার (Julius Caesar) থেকে যিনি ক্যালেন্ডার সংশোধনের কাজে বিরাট ভূমিকা নিয়েছিলেন
অগাস্ট মাস রোম-ম্রাট অগাস্টাস (Augustus) থেকে, তার যুদ্ধবিজয় উপলক্ষে নাম পেয়েছিল
সেপ্টেম্বর মাসের নাম আসছে লাতিন শব্দ সেপ্তেম (septem) থেকেযার মানে সপ্তম অক্টোবর লাতিন শব্দ অক্তা (octo) থেকে আসছে, যার মানে হল অষ্টম নভেম্বর হল নোভেম (novem) থেকে, যার মানে নবম ডিসেম্বর মাস হল লাতিন শব্দ দেসেম (decem) থেকে, যার মানে দশম নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ শেষের এই চারটে মাস ক্যালেন্ডার সংশোধনের আগে তাদের পূরণবাচক সংখ্যা-অনুযায়ী মাস ছিল
- - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - 
# দেখো, আমি রাত ও দিনকে দুটি নিদর্শন বানিয়েছি৷ রাতের নিদর্শনকে বানিয়েছি আলোহীন এবং দিনের নিদর্শনকে করেছি আলোকোজ্জ্বল, যাতে তোমরা তোমাদের রবের অনুগ্রহ তালাশ করতে পারো এবং মাস ও বছরের হিসেব জানতে সক্ষম হও। এভাবে আমি প্রত্যেকটি জিনিসকে আলাদাভাবে পৃথক করে রেখেছি। (সুরা বনী ইসরাঈল ১২)
#  রাতের আবরণ দীর্ণ করে তিনিই ফোটায় উষার আলো। তিনিই রাতকে করেছেন প্রশান্তিকাল। চন্দ্র ও সূর্যের উদয়াস্তের হিসেব তিনিই নির্দিষ্ট করেছেন। এসব কিছুই সেই জবরদস্ত ক্ষমতা ও জ্ঞানের অধিকারীর নির্ধারিত পরিমাপ৷(সুরা আনআম ৯৬)
# আসলে যখন আল্লাহ আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন তখন থেকেই আল্লাহর লিখন ও গণনায় মাসের সংখ্যা বারো চলে আসছে৷(সুরা আত তাওবাহ - ৩৬)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য