খেলনার বিবর্তন যুগে যুগে - Evolution of Toys




খেলনার বিবর্তন যুগে যুগে - Evolution of Toys
দিনে মাটির পুতুল, খেলনা বন্দুক, মোটর গাড়ি, নিদেনপক্ষে একখানা বাশির জন্যে ঘ্যানঘ্যান করে বড়দের কান ঝালাপালা করেনি এমন লক্ষ্মী ছেলেমেয়ে তোমাদের মধ্যে একজনও পাওয়া যাবে না বোধকরি আমাদের সবার শৈশবের নিত্যসঙ্গী খেলনা ঝুমঝুমি দিয়ে শুরু, তারপর কত রকমারি খেলার উপকরণ হাঁড়িকুড়ি, পুতুল, কাটা কাপড়ের টুকরো, লুডোএসব রইল মেয়েদের ভাগে আর ছেলেদের জন্যে ঘোড়া, তীর-ধনুক, পিস্তল আর উড়োজাহাজ বোকা পুতুলটা কথা বোঝে না, ভাত দিলে খায় না কাপড় পরালে হাসে না কিন্তু তবুও তারই জন্যে কত কথা আর কত সংসার সাজানোর ধুম এদিকে ঘোড়া ছোটাতে গিয়ে সওয়ারী নিজেই হয়রান, বন্দুকের গুলি ছোড়ার আগে মারার কৌশলটা ভালোভাবে শিখিয়ে পড়িয়ে দিতে হয় কিন্তু সেই ফাঁকি মেনে নিয়েও খেলনা চাই, খেলনা না হলে চলবেই না সত্যি খেলনা যেন জাদু জানে, আমাদের সব্বার ছেলেবেলার দিনগুলোকে কী নেশায় যে মাতিয়ে রাখে খেলনাগুলো! কিন্তু তোমরা কি কখনও ভেবে দেখেছ যে এই খেলনা তৈরির বুদ্ধি মানুষের মাথায় এল কী করে, কবে তৈরি হয়েছিল পৃথিবীর প্রথম খেলনা? এটা মানুষেরই স্বভাব যে নতুন, অভাবিত কিছু দেখলে সে খুশি হয় ক্ষণকালের জন্যে হলেও নতুনকে পেয়ে সে ভুলে যায় তার পারিপার্শ্বিকের কথা, অভাবিতের চমক তাকে ভুলিয়ে দেয় বাস্তবজীবনের দুঃখ বেদনা মানবেতিহাসের আদিযুগে কোনো এক মা হয়তো তার ক্রন্দনরত শিশুকে ভোলাবার জন্যে তার সামনে ঝুমঝুম করে দুলিয়ে দিলেন শঙ্খ-ঝিনুকের মালা, হয়তো-বা শিশুর হাতে তুলে দিলেন একমুঠো নুড়ি পাথর সেই থেকে শুরু খেলনার ইতিহাস কিন্তু শিশুর খেলার জন্যে প্রথম উপকরণটি কবে তৈরি হয়েছিল সে-কথা কেউ বলতে পারে না
প্রত্নতাত্ত্বিকেরা বলেন, ঈসা (আঃ) এর জন্মের তিন হাজার বছরেরও আগে মেসোপটেমিয়ায় সুগঠিত খেলনার প্রচলন ছিল সেই সময়কার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের সঙ্গে পাওয়া গেছে পুতুলের আসবাবপত্রের ভাঙাচোরা অবশিষ্ট, আর চাকার গাড়ি মিশরের প্রাচীন সমাধি গুলোতেও আর সব উপকরণের সঙ্গে খেলনার অস্তিত্ব চোখে পড়েছে
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক পটভূমিতে গড়ে উঠেছে বিশিষ্ট ধরনের খেলনা প্রাচীন গ্রিসের ছেলেমেয়েদের কাছে প্রিয় খেলনা ছিল নৌকা আর রথ তৎকালীন গ্রিসের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে ছোটদের এই পছন্দের স্পষ্ট একটা সম্পর্ক দেখতে পাওয়া যায় গ্রিসে পোড়ামাটির পুতুল, বল ইত্যাদিও শিশুদের কাছে সমানভাবে আদৃত হত রোমানদের আমলে তৈরি হল যুদ্ধের রথ, কাঠ-খোদাই ঘোড়া, মার্বেল আর অস্ত্রধারী সৈন্য ইতিহাসের পথ ধরে বিবর্তিত হতে-হতে খেলনা আমাদের সময়ে এসেও যুগের চেহারাটা তুলে ধরছে স্পষ্টভাবে যে-কোনো খেলনার দোকানে গেলেই তখন তোমরা দেখতে পাবে সারি-সারি সাজানো প্লেন, হেলিকপটার, রকেট, ট্যাঙ্ক, মেশিনগান, ক্যামেরা, টেলিভিশন ইত্যাদি কত কী! কিন্তু এখন থেকে মাত্র বিশ-ত্রিশ বছর আগেও ছোটদের একখানা বন্দুক অথবা বিশ্রী মডেলের গাড়ি নিয়েই খুশি থাকতে হত বর্তমান সময়ের খেলনাগুলোর রূপ প্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে সমকালীন বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি সম্পর্কে সুন্দর একটা ধারণা পাওয়া যাবে কিন্তু এমন কিছু খেলনাও আছে যা নাকি চিরন্তন, কালের ছাপ লাগে শুধু তার নির্মাণকৌশলে যেমন, পুতুল, ঘুড়ি, বল ইত্যাদি ইত্যাদি মিশরের প্রাচীন সমাধিতে পাওয়া মাটির পুতুলের সঙ্গে আধুনিক যুগের পুতুলের তফাৎ অনেক, তবুও পুতুল ঠিক পুতুলই আজকের পুতুল কথা বলে, হাত-পা নাড়ে, ওষুধ খায়, কাঁদে কিন্তু তবুও পোড়ামাটির পুতুলের কদর ছোটদের কাছে একটুও কমে যায়নি এমনি ধরনের আরও খেলনা হচ্ছে ঘুড়ি, লাটিম ইত্যাদি আজ থেকে প্রায় ২২০০ বছর আগে প্রথম ঘুড়ি আবিষ্কার করেন চীনের এক সমর-নেতা জেনারেল হা-সিন ছোটদের মনোরঞ্জন অবশ্য মোটেও তার উদ্দেশ্য ছিল না তার নিজের শিবির থেকে শত্রুর বহরের দুরত্ব মাপার জন্যেই আকাশে ঘুড়ি উড়িয়েছিলেন ওটাই শেষপর্যন্ত খেলনার রূপ নেয় কিন্তু এই খেলনা-ঘুড়িই মানুষকে এক আশ্চর্য বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারে সহায়তা করেছে তোমরা নিশ্চয়ই জানো যে বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন একদিন ঘুড়ির মাধ্যমেই প্রমাণ করেছিলেন যে বজ্রপাতের সঙ্গে বিদ্যুতের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে এর পরও ঘুড়ি মানুষকে উড়োজাহাজ তৈরি করতে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে বলে মনে করা যেতে পারে বনবন করে ঘোরা লাটিমও আবর্তন, পরিক্রমণের সূত্র ভালোভাবে বুঝতে মানুষকে সাহায্য করেছে কাজেই দেখতে পাচ্ছ, খেলনা শুধুমাত্র খেলনা নয়; শিশুদের অজান্তেই খেলনাগুলো শিক্ষামূলক ভূমিকা পালন করে যায়
প্রথমত, খেলনার মাধ্যমেই শিশুরা বড়দের জীবনধারার সঙ্গে পরিচিত হয় পুতুল নিয়ে ঘরকন্না, অথবা ঘোড়ার পিঠে চড়ে তেপান্তরে যাত্রা-এ সবকিছুই ছোটদের বৃহত্তর জীবনের মুখোমুখি হতে প্রেরণা যোগায়
দ্বিতীয়ত, খেলনা যুগের নিদর্শনের সঙ্গে ছোটদের পরিচিতি ঘটিয়ে দেয় যেমন ধর, রকেট, নভোযান আর মহাশূন্যচারী কী, কেমন দেখতে, কী কাজে লাগে -এসব প্রশ্নের উত্তর বইপড়ারও বহু আগে আজকালকার ছোট ছেলেমেয়েরা শিখে ফেলে খেলনার মাধ্যমে
তৃতীয়ত, খেলনাগুলো প্রতি যুগেরই সামাজিক, রাজনৈতিক ও ছবি তুলে ধরে রাখে কিন্তু খেলনার এতসব উপকারী ভূমিকা থাকা সত্তেও তা শেষপর্যন্ত ছোটদের খেলারই উপকরণ খেলনা খেলতে শেখায় বলেই তার মাধ্যমে ছোটদের শিক্ষাদানের জন্যে সুন্দর উপায় বের করা হয়েছে খেলনা দিয়ে ছোটরা গুনতে ও অঙ্ক কষতে শেখে, শব্দ বানায়, আরও কত কী! বিজ্ঞানের অভাবনীয় উন্নতির সঙ্গে-সঙ্গে খেলনা তৈরির ক্ষেত্রে এখন যুগান্তর এসেছে, শিক্ষার ক্ষেত্রে খেলনার ভূমিকাও ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে কিন্তু সাবধান, ছোটদের ও-কথা যেন বুঝিয়ে দিও না তাহলে তারা আর কক্ষনো খেলনা ছোঁবে না আঁকাআঁকি যতক্ষণ খেলা থাকে ততক্ষণই ভালো, কর্তব্য হয়ে দাঁড়ালে তার চাইতে বড় ভ্যাজাল আর কিছু নেই

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য