বাংলা ভাষার শব্দের কথা - আনিসুজ্জামান


 
বাংলা ভাষার শব্দের কথা - আনিসুজ্জামান
বাংলা ভাষার শব্দের কথা - আনিসুজ্জামান
ত্যেক ভাষায় নানা সম্পদ আছে। শব্দের ভাণ্ডার তার মধ্যে একটা বড় সামগ্রী। শব্দের সম্পদ বাড়লে যে-ভাষার প্রকাশ-ক্ষমতা যায় বেড়ে, সে-ভাষাকে বলা যায় আরো উন্নত ভাষা। কিন্তু শব্দের সম্পদ বাড়ে কী করে?
তার দুটো উপায় আছে : ধাতুর সঙ্গে বা শব্দের সঙ্গে প্রত্যয় যোগ করে নতুন শব্দ তৈরি করা যায়; আর যায় অন্য ভাষা থেকে শব্দ ধার করে এনে।
বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডারের দিকে একবার তাকাও। দেখবে, নানা উৎস থেকে শব্দ জড়ো হয়েছে সেখানে। কোনো শব্দ মূলে সংস্কৃতের ঘরে ছিল, এখন বাসা বেঁধেছে আমাদের ভাষায়। কোনো শব্দ সংস্কৃতের ঘর থেকে রূপ বদলে এসেছে। কোনো শব্দ এসেছে এদেশের পুরোনো অধিবাসীদের মুখ থেকে। কোনো শব্দ এসেছে বিদেশ থেকে জাহাজে চড়ে। সব শব্দই ঠাই করে নিয়েছে আমাদের ভাষায়।
কথাটা আরেকটু পরিষ্কার করে বলা যাক।
নদী যেমন চলতে চলতে তার গতি বদলায়, নিজেকে বিস্তৃত করে দেয়, সঙ্কুচিত করে নেয়, ছোট বড় শাখা প্রশাখার রূপ ধরে; ভাষার গতিতেও তেমনি পরিবর্তন হয়। এই পরিবর্তনের মুখেই মূল ভাষাস্রোত থেকে পৃথক হয়ে অন্যান্য ভাষা গড়ে ওঠে। এমনিভাবে বাংলাভাষাও একদিন স্বতন্ত্র চেহারায় দেখা দিল প্রায় বারো-তেরো-শো বছর আগে।
পৃথক হল বটে, কিন্তু পূর্বপুরুষের সম্পত্তির ভাগ নিয়েই তবে সে আলাদা হল। বাংলাভাষার ভাগে উত্তরাধিকারসূত্রে যা এল, তার মধ্যে শব্দসম্পদ একটা বড় জিনিশ। আগের ভাষায় যেসব সংস্কৃত শব্দ ছিল, তার অনেকখানি বাংলাভাষা আত্মসাৎ করে নিল। এর মধ্যে একদল শব্দের কোনো বদল হল না : পণ্ডিতেরা সেসব শব্দকে বলেন তৎসম শব্দ। তৎসম মানে তার সমান, অর্থাৎ সংস্কৃতের সমান। মোট শব্দসামগ্রীর হিশেবে বাংলাভাষায় তৎসম শব্দ আছে শতকরা ৪৪ ভাগ।
কিন্তু কিছু সংস্কৃত শব্দের রূপ কালে-কালে বদলে গেল আমাদের উচ্চারণে। যেমন, সংস্কৃত বা তৎসম শব্দ জ্যোৎস্না উচ্চারণ বদলে হয়ে গেল জোছনাএমন সব শব্দকে বলা হয় অর্ধ-তৎসম শব্দ।
আরেক দল শব্দ বাংলাভাষায় আসবার আগেই বদলে গিয়েছিল। সেগুলোকে বলা হয় তদ্ভব শব্দ। তদ্ভব মানে তার থেকে উৎপন্ন অর্থাৎ সংস্কৃত থেকে তৈরি হয়েছে এমন শব্দ। যেমন সংস্কৃত রাজ্ঞিকা শব্দটি রন্নিআ হয়ে গিয়েছিল আগেই; তার থেকে বাংলায় হল রাণী। তবে সব তদ্ভব শব্দই সংস্কৃত মূল থেকে আসেনি; অন্য জাতের শব্দও সংস্কৃতের হাত ঘুরে এসেছে। এদেশের পুরোনো অধিবাসীরা যেসব ভাষায় কথা বলত, সেসব ভাষার অনেক শব্দও চেহারা বদলে এইভাবে বাংলার শব্দভাণ্ডারে এসে জমা হয়েছে। আবার সেসব ভাষার অনেক শব্দ বিনা-ছদ্মবেশেই বাংলার মধ্যে ঢুকে পড়েছে। যেমন, দুর্ভিক্ষ অর্থ আমরা আকাল বলি : ও-শব্দটা আসলে সাঁওতালি বা মুণ্ডা-ভাষার শব্দ। চাউল, চুলাও তাই। পাক-ভারতের অন্যভাষার শব্দ থেকেও কিছু কিছু শব্দ ধার করা হয়েছে। যেমন, গুজরাটি শব্দ হরতাল, পাঞ্জাবি শব্দ চাহিদা
অর্ধ-তৎসম, তদ্ভব এবং ধারেকাছের অন্যভাষার ধার-করা শব্দকে একসঙ্গে মিলিয়ে দেশী শব্দ বলা যায়। বাংলাভাষায় এই জাতীয় শব্দের পরিমাণ ৫১.৪৫ ভাগ।
বাকি শব্দগুলো কোত্থেকে এল? সেগুলো হচ্ছে বিদেশী শব্দ। মোট বিদেশী শব্দের পরিমাণ শতকরা ৪.৫৫ ভাগ। এর মধ্যে ফারসি এবং ফারসি ভাষার সূত্রে আগত আরবি তুর্কি প্রভৃতি শব্দের পরিমাণ শতকরা ৩.৩০; আর ইউরোপীয় শব্দের পরিমাণ শতকরা ১.২৫। অন্যান্য ভাষারও কিছু শব্দ আছে; কিন্তু সংখ্যায় তারা এত কম যে, শতকরার হিশেবে প্রায় কিছু না। বিদেশী শব্দগুলো সম্পর্কে একটু বিস্তারিত বিচার করা যাক। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দী থেকে পারস্যের সঙ্গে যোগ ভারতবর্ষের। মুসলমানেরা এদেশে আসার অনেক আগেই তখনকার ভাষায় কয়েকটা ফরাসি শব্দ ঢুকে পড়েছিল। যেমন, মিহির (সূর্য) শব্দটি বাংলাভাষার স্বতন্ত্র অস্তিত্বের আগেই ভারতীয় ভাষায় চালু হয়েছিল। তেমনি ফারসি (ইরান) পুস্ত (বই) শব্দ থেকে পুস্তক শব্দের চল হয়েছিল। মুচি সেকরা এসেছে এভাবে। খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতকে মুসলমানেরা বাংলাদেশ অধিকার করবার পর ফারসি শব্দের ব্যবহার বেড়ে যায়। সেই সূত্রে আরবি ও তুর্কি শব্দও অনেক ঢুকে পড়ে বাংলা ভাষায়। মুঘল আমলে সরকারি ভাষা ছিল ফারসি, উনিশ শতকের গোড়ার দিকেও সরকারি ভাষা হিসেবে ফারসি রয়ে যায়। ফলে, ফারসি-আরবি-তুর্কি শব্দ বেমালুম বাংলায় চলে আসে।  আইন, আদালত, উকিল, মোক্তার, কাজি, হাকিম, নাজির আরবি শব্দ। দারোগা তুর্কি ভাষার। পেয়াদা, জবানবন্দি ফরাসির। আবার, জেরা, রায়, জেলা আরবির। বাদশাতখত ফারসি, বেগমবিবি তুর্কি; নবাব আরবি। রায়ত, তালুক আরবি, জমি, আবাদ ফারসি। কামান, তীর, তোপ, জখম, বাহাদুর, সেপাই ফারসি শব্দ। খোদা, নামাজ, রোজা, দরবেশ তাই। কোরবানি, হজ, ফকির, মোল্লা আবার আরবি। কুলফি-বরফে- কুলফি আরবি আর বরফ ফারসি। কাগজ ফারসি; কলম, কেতাব, দোয়াত আরবি। কুলি তুর্কি; সাহেব আরবি। চাকর ফারসি; নকর আরবি। কম, জোর, রোজ, যাদু, খরচ, নমুনাএগুলো ফারসি। খারাপ, খাসা, খালি, খবর’—এগুলো আরবি। জামা, রুমাল ফারসি। কাঁচি, চাকু-তুর্কি। শাদা ফারসি; লাল আরবি থেকে। এমন অনেক আছে।
ইউরোপীয় শব্দগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পুরোনো হল গ্রিক শব্দখ্রিস্টপূর্বকাল থেকে গ্রিসের সঙ্গে এদেশের সম্পর্ক। বাংলাভাষার স্বাতন্ত্রের আগে রূপান্তরিত হয়ে যেসব গ্রিক-শব্দ এদেশের ভাষায় চাল হয়েছিল, তার মধ্যে দাম সুড়ঙ্গের সঙ্গে আমরা সবচেয়ে বেশি পরিচিত। কিন্তু পরে এসেও পর্তুগিজ শব্দ সংখ্যায় ছাড়িয়ে গেল গ্রিককে। তার কারণ পর্তুগিজদের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগ ছিল আরো প্রত্যক্ষ। আজ আর চেনা যায় না, এমন অন্তত একশ শব্দ পর্তুগিজ ভাষা থেকে নেওয়া। আতা আনারস, জোনা কপি, আলকাত্রা ইস্পাত, কামরা জানালা, গামলা, পেরেক আলপিন, মিস্ত্রি মাস্তুল’–এর সবই পর্তুগিজ শব্দ। আলমারি চাবি, ফিতা, কামিজ বোতামকে আজ আর পর্তুগিজ বলে কে চিনবে?
ওলন্দাজ ভাষা থেকে এসেছে তাসের নামগুলো—‘হরতন', রুইতন, ইস্কাবনআর এসেছে ইসক্রুপ
ফরাসি (ফ্রান্স) থেকে এসেছে কার্তুজ কুপন শব্দদুটো, আর ওলন্দাজ, ইংরেজ, দিনেমার প্রভৃতি জাতিবাচক নাম।  চা এসেছে চীনা ভাষা থেকে, লুঙ্গি এসেছে বর্মী ভাষা থেকে, কুইনাইন এসেছে পেরু-র (দেশ) ভাষা থেকে। রিকশা জাপানের, ক্যাঙ্গারু অস্ট্রেলিয়ার, ব্রো দক্ষিণ আফ্রিকার শব্দ। লামা এল তিব্বতী ভাষা থেকে, রুশ থেকে এল বলশেভিক। সাগু বা সাবু এসেছে মালয় থেকে, ম্যাজেন্টা ইটালিয়ান ভাষা থেকে।
আর ইংরেজি শব্দের তো কথাই নেই। গত শতকে মনেপ্রাণে বাঙালি, এমন বিদ্বানদের একদল একটা সমিতি করেছিলেন। তাঁরা নিয়ম করেছিলেন যে, তাঁদের সভায় যে-কেউ একটা ইংরেজি শব্দ বলবে, তাকে এক আনা জরিমানা দিতে হবে। হা হা হা।
প্রতি বিদেশী শব্দ বলার জন্যে এক পয়সা ধার্য হলে সারাদিনে তোমাকে কত পয়সা দিতে হবে, একবার হিশেব করে দেখো
গিনিস বুক অব রেকর্ডস
দক্ষিণ আফ্রিকার রাজনীতিবিদ জন ক্রিশ্চিয়ান স্পাটস (১৮৭০-১৯৫০) প্রবীণ বয়সে পাঁচ হাজার বই মুখস্থ করেছিলেন।